প্রতি ঈদে কেন চামড়ার দাম কমে যায়

ফাইল ছবি
ঈদের ছুটি শেষে মানুষ যখন আবারও যার যার কর্মস্থলে ফিরছেন, তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে এক অস্বস্তিকর চিত্র। যত্রতত্র, সড়কের পাশে কিংবা পরিত্যক্ত জায়গায় পড়ে আছে কোরবানির পশুর চামড়া।
রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে বাতাসে ভাসছে পচা চামড়ার তীব্র দুর্গন্ধ। এ বছরও দেশের অনেক জায়গায় চামড়ার ন্যায্য দাম না পেয়ে ক্ষোভে-দুঃখে তা রাস্তায় ফেলে গেছেন মৌসুমী ব্যবসায়ী ও কোরবানিদাতারা। প্রশ্ন উঠেছে, প্রতি বছর ঈদ এলেই কেন কাঁচা চামড়ার বাজার এভাবে ধসে পড়ে?
চামড়া খাতের এই সংকটের শুরু আজ নয়। ট্যানারি শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করতে সাভারে স্থানান্তরের পর থেকে প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে বাজারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ চামড়া চলে আসে, কিন্তু সেই তুলনায় দেশীয় ট্যানারিগুলোর চাহিদা থাকে খুবই কম। এর বড় কারণ, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে না পারায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়ার গ্রহণযোগ্যতা ও দাম দুই-ই কমে গেছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, দেশের হাতেগোনা কয়েকটি ট্যানারির মাত্র আন্তর্জাতিক মানের লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ সনদ রয়েছে। এই সনদ ছাড়া ইউরোপ বা আমেরিকার মতো উন্নত ও উচ্চমূল্যের বাজারে চামড়া রপ্তানি করা অসম্ভব। ফলে বেশিরভাগ ট্যানারি কম দামের বাজারের ওপর ভরসা করতে বাধ্য হচ্ছে। আড়তদার ও কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের দাবি—ট্যানারিগুলোর চাহিদা কম থাকা এবং ঈদের সময় চামড়া কেনার মতো পর্যাপ্ত মূলধন বা অর্থসংকটের কারণে তারা মাঠপর্যায়ে বেশি দাম দিতে পারছেন না। ফলে সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চামড়া খাতের এই বিপর্যয় মূলত দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো দাম পেতে সিইটিপির শতভাগ সংস্কার এবং ট্যানারিগুলোর আন্তর্জাতিক সনদ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে বড় ট্যানারিগুলোকে নিজস্ব বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করা এবং মাঠপর্যায়ে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে লবণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে বিপুল সরবরাহ, আন্তর্জাতিক সনদের অভাব, অর্থসংকট এবং সংরক্ষণের অব্যবস্থাপনাই প্রতি বছর এই জাতীয় সম্পদের অপচয় ডেকে আনছে। এই বহুমুখী সংকটের স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করা না গেলে, প্রতি ঈদের পর চামড়া নিয়ে এমন হাহাকার আর লোকসানের গল্প বারবার ফিরে আসবে।

এসএএস/