বাংলাদেশ কি ঋণের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখন এক গভীর ও জটিল সন্ধিক্ষণে। একদিকে ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ, অন্যদিকে আশঙ্কাজনক রাজস্ব ঘাটতি—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে দেশের অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে প্রচণ্ড চাপ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশ এখন এক ‘ঋণের ফাঁদে’ পড়ার আগাম বার্তা দিচ্ছে। যে উন্নয়ন একসময় আশার আলো দেখিয়েছিল, সেই উন্নয়নের ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঋণের ওপর অতি-নির্ভরতা এখন জাতীয় স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, দৈনন্দিন খরচ মেটাতেও সরকার এখন পুরোপুরি ঋণের ওপর নির্ভরশীল। চলতি অর্থবছরের পুরো ১২ মাসের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তার প্রায় পুরোটাই শেষ হয়ে গেছে মাত্র ৯ মাসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকার ইতিমধ্যে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও ভর্তুকি মেটাতে হিমশিম খেয়ে সাময়িকভাবে টাকা ছাপিয়েও ঋণ নিতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

ঋণের এই পাহাড় যেন দিন দিন আকাশচুম্বী হচ্ছে। ২০০৯ সালে যেখানে মোট সরকারি ঋণ ছিল মাত্র ২ লাখ কোটি টাকা, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ, গত দেড় দশকে ঋণের বোঝা বেড়েছে ১০ গুণেরও বেশি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সম্প্রতি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বিশাল বোঝা নিয়েই বর্তমান সরকারকে কাজ শুরু করতে হয়েছে। এই বিপুল দায় মেটাতে গিয়ে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি বারবার হোঁচট খাচ্ছে।

চমকপ্রদ তথ্য হলো, ঋণের এই কাঠামোর বড় অংশই এখন অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসা। বর্তমানে মোট ঋণের প্রায় ৫৭ শতাংশই নেওয়া হচ্ছে দেশের ভেতর থেকে। বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কমাতে সরকার এই পথ বেছে নিলেও এতে তৈরি হচ্ছে নতুন সংকট। ব্যাংকিং খাত থেকে সরকার অতিরিক্ত টাকা তুলে নেওয়ায় বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে নতুন শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা অর্থনীতির চাকা সচল রাখার পথে বড় বাধা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণের সুদ পরিশোধ। বর্তমানে বাজেটের অন্যতম প্রধান ব্যয়খাতে পরিণত হয়েছে এই সুদ ব্যয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই সরকারের মোট ব্যয়ের প্রায় ২৬ শতাংশ চলে গেছে শুধু ঋণের সুদ দিতে। শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বরাদ্দের চেয়েও এখন সুদ পরিশোধের অঙ্ক বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্প বা এডিবি বাস্তবায়নের হার গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হওয়া সত্ত্বেও ঋণের লাগাম টানা যাচ্ছে না, কারণ পুরোনো ঋণের কিস্তি শোধ করতেই চলে যাচ্ছে বড় এক তহবিল।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ তথা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানসহ প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদরা একে ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদ’ ও ‘ঋণ সংকটের’ পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন।

তারা বলছেন, এখনই যদি করজালের সম্প্রসারণ, রাজস্ব আদায়ে সংস্কার এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই ঋণের বোঝাই হবে আগামীর অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সময় থাকতেই কাঠামোগত সংস্কারের পথে না হাঁটলে উন্নয়নের এই রঙিন ফানুস ঋণের চাপে চুপসে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

এসএএস/