দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প, কতটা মেটাতে পারবে বিদ্যুতের চাহিদা

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ এখন এক নতুন জ্বালানি যুগে প্রবেশ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস, কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরশীল থাকার পর এবার দেশ যুক্ত হয়েছে পারমাণবিক শক্তির তালিকায়। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির একটি বড় প্রতীক। 

২৮ এপ্রিল এই প্রকল্পে জ্বালানি বা ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করেছে এবং এখন বিশ্বে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর কাতারে যুক্ত হয়েছে।

এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে রয়েছে দুটি পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর। প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ পুরো কেন্দ্রটি চালু হলে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। বছরে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে এই কেন্দ্র, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এককভাবে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রাথমিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে প্রথম ইউনিট পূর্ণ ক্ষমতায় পৌঁছাবে। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় ইউনিট চালু হয়ে ২০২৭ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্প পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাবে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র কি দেশের সব বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে পারবে? বাস্তবতা হলো, না। বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, এবং এই একটি প্রকল্প দিয়ে পুরো চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। তবে এটি দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করবে এবং নিরবচ্ছিন্ন বা বেস-লোড বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে, যা শিল্প ও অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিদ্যুৎ কি রপ্তানি করা যাবে? বর্তমানে এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করা। সরাসরি বিদ্যুৎ রপ্তানির কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে ভবিষ্যতে যদি উৎপাদন বাড়ে এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সংযোগ উন্নত হয়, তাহলে সীমিত পরিসরে রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

এখন আসা যাক এই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, নিরাপত্তা ইস্যুতে। এমন একটি বড় মাইলফলক অর্জনের পরও জনমনে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কতটা নিরাপদ? জানা গেছে, এখানে ব্যবহৃত তৃতীয় প্রজন্মের আধুনিক রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতেও স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণ ও পরিচালনায় আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা-এর কঠোর নিরাপত্তা মান অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক, এবং রূপপুর প্রকল্পেও সেই মান বজায় রাখা হয়েছে।

রূপপুর প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি। এটি দেশের গ্যাস ও আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একবার চালু হলে দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। এছাড়া এটি পরিবেশবান্ধব, কারণ এতে কার্বন নির্গমন খুবই কম। এই কেন্দ্রের আয়ু সাধারণত ৬০ বছর, যা প্রয়োজনে আরও বাড়ানো সম্ভব।

এসএএস/